ফটোগ্রাফার থেকে কারাবন্দি: শহিদুল আলম

0 593

ঐতিহ্যবাহী মার্কিন ম্যাগাজিন টাইম প্রতিবছরের মতো এবারও বছরের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত সংখ্যা প্রকাশ করেছে। চলতি বছর অর্থাৎ ২০১৮ সালের ‘টাইম পারসন অব দ্য ইয়ার’ ইস্যুতে প্রচ্ছদে ঠাঁই পেয়েছেন তুরস্কের সৌদি দূতাবাসে নিহত সাংবাদিক জামাল খাশোগিসহ চার সাংবাদিক। এছাড়া, এই বিশেষ সংখ্যায় আলোচিত সাংবাদিকদের তালিকায় রয়েছেন বাংলাদেশের স্বনামধন্য আলোকচিত্রী শহিদুল আলমও। তাকে তথ্য প্রযুক্তি আইনে গ্রেফতার করা হয়েছিলো নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের উসকে দেওয়ার অভিযোগে।

জামিনে মুক্তি পাওয়া শহিদুল টাইম ম্যাগাজিনকে জানিয়েছেন তার ফটোগ্রাফার থেকে কারাবন্দি হওয়ার গল্প। মঙ্গলবার (১১ ডিসেম্বর) ‘সাংবাদিকতা হুমকির মুখে, ফটোগ্রাফার থেকে কারাবন্দি হওয়া বাংলাদেশির ভয়ংকর গল্প’ শিরোনামে প্রকাশিত সেই সাক্ষাৎকারটিতে এলি ম্যাক্সলার মুখোমুখি হয়েছিলেন শহিদুল আলম। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়,

গত ত্রিশ বছর ধরে আলোকচিত্রী শহিদুল আলম (৬৩) তার ক্যামেরায় তুলে এনেছেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক উত্থান-পতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলো। আগস্টে আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারের দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমালোচনা করায় ‘মিথ্যা’ ও ‘উস্কানিমূলক’ মন্ত্যব্যের অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

ফটোগ্রাফার হিসেবে শহিদুলের হাতেখড়ি হয় ১৯৮০ সালে। তিনি রসায়ন শাস্ত্রে লন্ডনে পিএইচডি করছিলেন। সেসময় যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা ভ্রমণের সময় তিনি তার এক বন্ধুর জন্য নাইকন এফএম ক্যামেরাটি কিনেছিলেন। পরবর্তীতে সে বন্ধুটি ক্যামেরাটি না নেওয়ায় নিজের কাছে তা রেখে দেন শহিদুল।

শহিদুল আলম স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমি ওটা ব্যবহার করা শুরু করলাম। যখন আমি বুঝতে পারলাম সমাজকর্মী হিসেবে ছবি কতটা গুরুত্বপূর্ণ! তখনই আমি ফটোগ্রাফার হবার সিদ্ধান্ত নিলাম।

নিজ দেশে মানবাধিকার রক্ষার যুদ্ধে শহিদুল বর্তমানে একাই অন্যদের হয়ে লড়াই করছেন। যেমনটির শুরু হয়েছিল, স্বৈরশাসক এরশাদের সময়ে আন্দোলন ক্যামেরাবন্দি করা থেকে শুরু করে সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার রাজপথে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে। পরিণামে প্রশাসন তাকে কারাবরণ করিয়েছে, জেলখানায় নির্যাতন করেছে।

প্রকৃতপক্ষে শহিদুল আলমের অবদান ক্যামেরায় ছবি তোলার চেয়ে বেশি কিছু। তরুণ ফটোগ্রাফারদের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য শহিদুল ও সহযোগী রেহনুমা আহমেদ ১৯৮৯ সালে দৃক গ্যালারি প্রতিষ্ঠা করেন। এরশাদের উৎখাতের সে সময়টাতে আন্দোলন জোরালো হয়েছিলো। এ সম্পর্কে শহিদুল বলেন, আমরা যুদ্ধে নেমেছিলাম। এই যুদ্ধ ছিলো সামাজিক ন্যায় বিচারের জন্য। সে জন্য যাই করতে হোক না কেন আমাদের প্রচুর সহযোদ্ধা প্রয়োজন ছিলো।

১৯৯৮ সালে শহিদুল আলমের হাতে গড়ে উঠে ফটোগ্রাফি বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘পাঠশালা সাউথ এশিয়ান মিডিয়া ইনস্টিটিউট’। ২০০০ সালে তার তত্ত্বাবধানে আয়োজন করা হয়, এশিয়ার প্রথম আন্তর্জাতিক ফটোগ্রাফি ফেস্টিভ্যাল ‘ছবিমেলা’র। ২০০৩ সালে প্রথম ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো জুরির আসন অলঙ্কিত করাসহ অসংখ্য সম্মাননা পেয়েছেন শহিদুল। এরমধ্যে রয়েছে শিল্পক্ষেত্রে অবদানের জন্য বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘শিল্পকলা পদক’। 

তার আলোকচিত্রের ক্যানভাসে উঠে এসেছে, ১৯৯১ এর উত্তাল সময়ের নির্বাচনে কোন এর নারীর ভোট দেওয়া অথবা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে আদিবাসীদের জীবন-বৈচিত্র্য। শহিদুলের ফটো সিরিজি ‘মাইগ্রেন্ট সোল’- এ স্থান পেয়েছে শ্রমজীবী ও আখচাষীদের গল্প। ইসলামী জঙ্গিবাদ বিষয়ে ‘এমব্রেসিং দ্য আদার’ আলোকচিত্র প্রদর্শিত হয়েছে ঢাকার বাইতুর-রউফ মসজিদের অভ্যন্তরে।

দীর্ঘদিন ধরে কাজের ক্ষেত্রে শহিদুলকে সহজাত অবজ্ঞারও শিকার হতে হয়েছে। শহিদুল বলেন, ফটোসংবাদিকতায় অধিকাংশ পরিচিত মুখই পশ্চিমাদের। ক্যামেরায় তারা বাংলাদেশকে ‘বঞ্চনা ও যাতনা’র চোখে দেখতেই অভ্যস্ত। ‘তৃতীয় বিশ্ব’ ‘উন্নয়নশীল’ অথবা ‘গ্লোবাল সাউথ’ এ ধরনের শব্দ চয়ন না করে শহিদুল এ অঞ্চলকে ‘ম্যাজরিটি ওয়ার্ল্ড’ বা ‘আউট অব ফোকাস’ তকমা দিতেই বেশি পছন্দ করেন।

বাংলাদেশের  আইনপ্রয়োগকারী বাহিনী র‌্যাপিড একশন ব্যাটেলিয়নের (র‌্যাব) বিচারবর্হিভূত হত্যাকণ্ডের প্রতিবাদে শহিদুল ২০১০ সালে ‘ক্রসফায়ার’ নামে একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলেন। পুলিশ তা বন্ধ করে দিতে চেষ্টা করে। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদও হয়।

সামাজিক আন্দোলনের একই ঝড় উঠে যখন বেপরোয়া বাসের আঘাতে ঢাকার সড়কে প্রাণ হারায় দুই শিক্ষার্থী। নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে নামে হাজার হাজার মানুষ। ধীরে ধীরে আন্দোলন বড় হয় সরকারকে মুখোমুখি হতে হয়, দুর্নীতি, বৈষম্যের মতো বিষয়ে। পুলিশ টিয়ার গ্যাস, রাবার বুলেট ও মোবাইল ইন্টারনেট সেবা স্তিমিত করে আন্দোলন বন্ধ করার চেষ্টা করে।

শহিদুল আলম সেসময় আন্দোলনে সমর্থন দিয়ে ফেসবুক লাইভে গর্জন তুলেছিলেন। আগস্টের ৫ তারিখে আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শহিদুল বলেন, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা যখন ছাত্রদের ওপর হামলা চালায় পুলিশ ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলো। এরপর কয়েকঘণ্টার মধ্যে শহিদুল আলমকে গ্রেফতার করে পুলিশ। আলম অভিযোগ করেন, তাকে প্রহার করা হয়েছে। আদালতে যখন শহিদুলকে দাঁড় করানো হয়, তিনি একা দাঁড়তে পারছিলেন না। তাকে কারাবন্দি থাকতে হয় ১০৭ দিন ধরে। 

শহিদুলকে গ্রেফতারের ঘটনার নিন্দা জানান নোয়াম চমস্কি ও অরুন্ধতী রায়সহ বিশিষ্টজনেরা। ‘ফ্রি শহিদুল’ ক্যাম্পেইনে সমর্থন জানিয়ে শহিদুলের মুক্তি দাবি করে জাতিসংঘ ও ইউরোপীয়ান পার্লামেন্ট।

কারাবন্দি থাকা অবস্থায় অক্টোবরে শহিদুলকে দেওয়া হয় সম্মানজনক ‘লুসি হিউম্যানিনিট্রয়ান অ্যাওয়ার্ড ২০১৮’। নভেম্বরের ২০ তারিখে জামিনে মুক্তি পান তিনি। শহিদুল তাকে মুক্ত করা ও জীবন বাঁচানোর চেষ্টার জন্য তাকে সমর্থন করা সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।

এই অশান্ত সময়ে গত সপ্তাহে কিউবায় গ্রেফতার করা হয় কিউবার পারফরম্যান্স আর্টিস্ট তানিয়া ব্রুগুয়েয়ারাকে। তানিয়া শহিদুলের বন্দি থাকার সময়ে তাকে সমর্থন দিয়েছিলেন। এসব বিষয়ে শহিদুল বলেন, সারাবিশ্বে সাংবাদিকতা হুমকির মুখে আছে। আপনি শিক্ষক, নৃত্যশিল্পী, পেইন্টার অথবা সাংবাদিক যাই হোন না কেন, আমাদের ক্রমাগত যুদ্ধ করতে হচ্ছে। 

এদিকে, ৩০ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এখনো অস্থিরতা রয়ে গেছে। বিগত কয়েক মাসে ঢাকায়, বিরোধীদল ঘেঁষা সাংবাদিকদের গ্রেফতার ও নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশটিতে টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতা পেতে পারেন।

মানবাধিকার সংগঠন অ্যামেনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানায়, বাংলাদেশের তথ্য ও প্রযুক্তি আইনে গ্রেফতার হওয়া শহিদুল যদি সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানোর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয় তাহলে তার সর্বোচ্চ ১৪ বছর জেল হতে পারে।

শহিদুল তবু অনমনীয় ও ভয়-ডরহীন। বাংলাদেশে যখন ভোটগ্রহণ হবে শহিদুল আবার নামবেন ক্যামেরা হাতে অথবা লাইভ স্ট্রিমিং-এ।

‘আমি সাংবাদিক। তোমার যা ইচ্ছা হয় করতে পারো।’ শহিদুলের দৃঢ় প্রত্যয়।

Leave A Reply

Your email address will not be published.