‘ব্যাটেলশিপ পটেমকিন’: একটি বৈপ্লবিক চলচ্চিত্র

0 1,357

চলচ্চিত্র পরিচিতি:

Battleship Potemkin (Bronenosets Potyomkin, 1925, USSR, 75 mins)

Dir: Sergei Eisenstein.

Writer: Sergei Eisenstein and Nina Agadzhanova Shutko.

Cinematography: Eduard Tisse.

Original music: Edmund Meisel and Dmitri Shostakovich.

Editor: Sergei Eisenstein.

Art Director: Vasili Rakhals

Cast: Ivan Bobrov (Sailor), Beatrice Vitoldi (Woman with Baby Carriage), Nina Poltavseva (Woman with Pince-nez), Julia Eisenstein (Odessa Citizen), Grigori Aleksandrov (Chief Officer Giliarovsky), Aleksandr Antonov (Vakulinchuk), Vladimir Barsky (The Captain), Sergei Eisenstein (Ship Chaplain), Aleksandr Levshin (Petty Officer), Mikhail Gomarov (Sailor)

সূচনা:

বলশেভিক বিপ্লবের পর সোভিয়েতরা বিশ্বাস করলো, তাদের দেশটাকে নতুন ধ্যান-ধারণা ও মূল্যবোধে সাজাতে হবে। সেটা শুধু সামাজিক, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই নয়। শিল্প, সাহিত্য ও বিনোদনের ক্ষেত্রেও এই আমূল পরিবর্তনটা জরুরি। নিজেদের ভিন্ন পরিচয় তৈরির ক্ষেত্রে নতুন এই সুযোগ ও প্রতিযোগিতা সে সময়ের সোভিয়াত তরুণ প্রজন্ম ও সেখানকার বুদ্ধিবৃত্তিকরা খুব ভালো ভাবেই নিলো। আর এসব ক্ষেত্রে আগো-গোড়াই ছিলেন পুরোধা ব্যক্তি ভ্লাদিমির লেনিন। লেনিন জানতেন, তার নব্য দেশটাকে ঐক্যবদ্ধ ও বিপ্লবকে দৃঢ় সংহত করতে চাইলে বলশেভিক চেতনা সারা দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেয়াটা ফলপ্রসূ কাজ হবে। লেনিন এক্ষেত্রে মাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্রের জোরালো ভূমিকার কথা জানতেন। তাই সিনেমার সেই উষালগ্নেই এর গুরুত্ব সম্পর্কে খোদ সোভিয়েত নেতা জানান দিলেন, of all arts, for us the cinema is the most important. অর্থাৎ সকল শিল্পের মাঝে, চলচ্চিত্র ই অধিক তাৎপর্যময়।

অত:পর এর কিছুদিন পরেই লেনিনের নির্দেশ ও তার স্ত্রীর দায়িত্বে ১৯১৯ সালে মস্কোতে প্রতিষ্ঠা পেল পৃথিবীর প্রথম চলচ্চিত্র পাঠ্যালয় বা মস্কো ফিল্ম স্কুল। যেটির  VGIK নামে পরিচিতি ছিলো। সেসময়ের নামী পরিচালকরা VGIK’তে তখন সিনেমা নিয়ে গবেষণা করতেন, পড়াতেন ও সেমিনারের আয়োজন করতেন। নতুন সরকারের নির্দেশনা ছিলো তখন, গতানুগতিক নির্মাণ, ভারসাম্য, ধারাবাহিকতা থেকে সরে আসতে হবে। শিল্প নির্মাণে কল্পনা ও সমঝোতার চেয়ে প্রকট রুপে আসবে রূঢ় বাস্তবতা। তাদের উপর অর্পিত দায়িত্বগুলোর মধ্যে ছিলো ছোট ছোট বিভিন্ন প্রপাগান্ডা ছবি তৈরি করা। সেসব কে বলা হতো এজিটপ্রো (AGITPRO)

শিল্পের বাহ্যিক অবয়ব নির্মাণ ও উত্তোরত্তর নতুনত্ব আনতে গিয়ে স্বভাবতই সোভিয়েত নির্মাতারা ফিল্ম এডিটিং টেকনিক বা চলচ্চিত্র সম্পাদনার কর্মকৌশলের উপর জোর দিতে লাগলেন। ফলশ্রুতিতে তারা এ ধারায় এতটাই উন্নতি সাধন করলেন চলচ্চিত্রের নতুন এক রুপ উন্মোচিত হলো। সেই সাথে লেভ কুলশভ এর মতো সিনেমা তাত্ত্বিক, চলচ্চিত্রের সাথে মনস্তত্বের নতুন যোগাযোগ ও স্থাপন করতে সক্ষম হলেন। যা বিশ্বব্যাপী কুলশভ এফেক্ট নামে পরিচিত। ফিল্মি ‘মন্তাজের’ ধারণাগত উন্নয়ন ঘটে এ সময়টাতেই।

এসব পরীক্ষা নিরিক্ষার রেশ ধরে সোভিয়েত চলচ্চিত্রে নতুন একটি ধরন ও ধারণার জন্ম হলো। ফলশ্রুতিতে এর কিছু বছর পরই সেখানে এমন একটি চলচ্চিত্রের জন্ম হলো, যেটি সোভিয়েত চলচ্চিত্রকে বিশ্বব্যাপী সমধিক পরিচচিত করেই তুললোই এমনকি চলচ্চিত্রের অনেক মৌলিক, নতুন ও উদ্ভাবনী বিষয়যুক্ত হলো সেখানে। যেসব টেকনিক পরবর্তীতে অনেক বিখ্যাত সব পরিচালকেরা তাদের চলচ্চিত্রে ব্যবহার করেছেন। সের্গেই আইজেনস্টাইন ১৯২৫ সালে নির্মাণ করেন সেই চলচ্চিত্রটি। ছবিটির নাম  “ব্যাটেলশিপ পটেমকিন”। সমালোচকরা  এটিকে সব সময়ের অন্যতম প্রধান চলচ্চিত্র হিসেবে উল্লেখ করতে ও রেফারেন্স টানতেও কুন্ঠাবোধ করেন না।

এত ঢাক ঢোল পিটিয়ে যে ছবিটির প্রশংসা করা হচ্ছে। এটি অবশ্য একটি প্রপাগান্ডা চলচ্চিত্র। ১৯০৫ সালে জাপান যুদ্ধ থেকে ফেরত সোভিয়েত রণতরী ব্যাটেলশিপ পটেমকিনে জারের স্বৈরাচারী অফিসারদের বিরুদ্ধে একটি আচমকা নাবিক বিদ্রোহ ঘটে, খাবার অযোগ্য মাংস ও সে থেকে নিম্ন মানের স্যুপ পরিবেশনকে কেন্দ্র করে।পরবর্তীতে বিদ্রোহী নাবিকদের সমর্থন দেয় ওডেসা শহরের নাগরিকরা। এ জন্য শহরের হাজারো নির্দোষ মানুষের উপর বর্বর গুলি চালায় জারের নিযুক্ত সৈন্যরা। কয়েক হাজার মানুষ হতাহতের ঘটনা ঘটে। এই মর্মান্তিক ট্রাজেডি ও কেন্দ্রীভূত ক্ষোভ ১৯১৭ সালে জারের বিরুদ্ধে সোভিয়েত মানুষের চূড়ান্ত বিপ্লবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার রেখেছিলো বলে মনে করা হয়।

তাই বিদ্রোহের বিশ বছর পুর্তি উপলক্ষে এই ছবিটি নির্মাণের পরিকল্পনা করে তৎকালীন সোভিয়েত চলচ্চিত্র কমিটি এবং আইজেনস্টাইনকে তারা  সময় বেঁধে দেয়। আইজেনস্টাইন মাত্র সত্তর দিনে পুরো মুভিটি নির্মাণ সম্পূর্ণ করেন এর মধ্যে বিখ্যাত ওডেসাস্টেপ বানাতে সময় নেন সাত দিন বাকি দু সপ্তাহে ছবিটির দুর্দান্ত অভিনব এডিটিং করা হয়েছিলো

চলচ্চিত্রটির বর্ণনা:

ব্যাটেলশিপ পটেমকিন চলচ্চিত্রটিকে সর্বমোট পাঁচটি এপিসোডে ভাগ করা হয়।

প্রথম এপিসোড পিপল এন্ড ম্যাগটস (people and Maggots) এখানে দেখানো হয়েছে, নাবিকদের অসন্তোষ। উত্তাল সমুদ্রের ঢেউ দেখানোর মধ্য দিয়ে এ পর্বটি শুরু। তার পর লেনিনের উক্তি দিয়ে। যেটি ১৯০৫ সালে  The Plan of the St. Petersburg Battle নামের একটি আর্টিকেলে লেনিন লেখেন,

‘Revolution is war. Of all the wars known in history it is the only lawful, rightful, just, and truly great war in Russia this war has been declared and begun’.

যদিও মূল ছবিতে ছিলো আরেকজন বিপ্লবী Trotsky এর উক্তি। স্টালিন ক্ষমতায় আসার পর তার সাথে সম্পর্কের অবনতিরে জের ধরে তা মুছে লেনিনে কোট’টি বসান হয়। উল্লেখ্য, ২০০৪ সালে ছবিটির অনেকগুলো এডিশনে পুনরায় Trotsky কে সংযোজিত করা হয়।

দেশজুড়ে শ্রমিক আন্দোলন থেকে অনুপ্রাণিত একজন নাবিক Vakulinchuk যে কিনা নিম্নমানের খাবার ও অসন্তোষ এ নেতৃত্ব দেয়। জাহজের অন্য সব নাবিকেরাও তার সাথে সহমত পোষণ করে এবং আন্দোলনে যোগ দেয়।

দ্বিতীয় এপিসোড ড্রামা অন কোয়ার্টারডেক (Drama on the Deck), এ এপিসোডে জাহাজে নাবিক অসন্তোষ ও বিশৃঙ্গলাকে অফিসারা শক্ত হাতে দমন করার চেষ্টা করেন ও অমান্যকারীদের হত্যা করার নিষ্ঠুর আদেশ দেওয়া হয়।

জারের অফিসাররা তারপুলিন দিয়ে ডেকে ফায়ারিং স্কয়াডকে গুলি করতে বলেন বিদ্রোহীদের। তখন নাবিকদের একজন Vakulinchuk চিৎকার করে বলেন, “Brothers! Who are you shooting at?”

এমন প্রশ্নের মুখে ফায়ারিং স্কোয়াড ইত:স্তত করে।  অফিসার’রা পুনরায় জোর করলে, তখন পুরো জাহাজে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। অফিসরাদের সাথে নাবিকদের সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে বিদ্রোহীদের অগ্রগামী সৈনিক Vakulinchuk মারা যায় । জাহাজ বিদ্রোহী নাবিকদের নিয়ন্ত্রণে আসে।

তৃতীয় এপিসোড অ্যান অ্যাপিল ফ্রম দ্যা ডেড (An Appeal from the Dead) নাবিকরা তাদের নিহত নায়ক Vakulinchuk এর মৃতদেহ ওডেসা শহরের সমুদ্র উপকূলে রাখে শহরবাসীর সম্মান প্রদর্শনের জন্য। সস্মান প্রদর্শনের পর অন্তষ্ট্যক্রিয়া পরিণত হয় একটি রাজনৈতিক বিক্ষোভ ও বিদ্রোহের প্রতিচ্ছবি হিসেবে।

চতুর্থ এপিসোড, দ্যা ওডেসা স্টেয়ারকেস (The Odessa Staircase) এটি ওডেসা স্টেপ নামেও পরিচিত। ওডেসা শহরের সাধারণ জনগণ বিদ্রোহী সৈনিকদের প্রতি সংহতি জানাতে শহর উপকূলে জড়ো হয়। সেখানেও সপ্তাহ ধরে বিক্ষোভ ও অচলাবস্থা চলছিলো। তারা নাবিকদের খাদ্য ও রসদ সরবরাহ করে। এর জের ধরে জারের সৈন্যরা তখন সাধারণ জনগণের উপর গুলিবর্ষণ শুরু করে। ফলপ্রসূ না হলেও, পটেমকিন থেকেও তখন গোল ছোড়া হয়। এই পর্বটিতে আজেনস্টাইন মানবিক আবেদন সম্পূন্ন ইন্টেলেকচুয়্যাল মন্তাজের ব্যবহার দেখান। যেহেতু আজেনস্টাইন কুলশভ ওয়ার্কশপের ছাত্র ছিলেন, তিনি জানতেন কিভাবে এটির সঠিক ব্যবহার করা যাবে এবং নিজের সৃজনশীলতার প্রয়োগ ঘটনা।

পঞ্চম এপিসোড, মিটিং দ্যা স্রোয়াড্রন (Meeting the Squadron) খবর আসলো বিদ্রোহী পটেমকিনের নাবিদের বশ্যতা মানাতে অ্যাডমিরাল স্রোয়াড্রন নৌ বহর নিয়ে আসছেন। পটেমকিনের সৈন্যরা নিয়তিকে মেনে নেবার জন্য প্রস্তুত হয়। তারা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু বিপরীত জাহাজ থেকে গোলা ছোড়া হয়নি। বরং মিত্রতা ঘোষণা করা হয়। পটেকমকিনের সৈন্যরা আনন্দে ফেটে পড়ে।

(নোট: যদিও ছবির গল্পের সাথে আসল ইতিহাসের ভিন্নতা রয়েছে বাস্তবতা এতটা নায়কচিত ছিলো না যুদ্ধজাহাজ পটেকমকিন রুমানিয়ায় নির্বাসন গ্রহণ করেছিলো এবং এর সৈন্যরা যারা দেশে ফিরেছিলো তাদের হত্যা করা হয়)

এডিটিং সাউন্ড টেকনিক:

পূর্বেই বলা হয়েছে তখনকার সোভিয়েত চলচ্চিত্র নির্মাতারা এডিটিং এর উপর বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। নির্মাণের দিক থেকে তাদের ছবিতে হলিউডের চেয়ে অনেক বেশি বেশি শট থাকতো। ছবিটির শেষ দৃশ্যরাইজিং স্টোন লায়ন  একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য যা ইন্টেলেকচুয়্যাল মন্তাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ ওডেসা স্টেয়ার কেস  অংমটুকুতেও ভিন্ন নতুন কিছু সম্পাদনা কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছিলো সে কৌশলগুলো পরবর্তীতে বিভিন্ন চলচ্চিত্রে যা বারবার উঠে আসে

আবহ সংগীতের ক্ষেত্রে মুভিটি একটি নতুন ধারার সূচনা করে। প্রধান আবহ সংগীত নির্মাতা Meisel মাত্র বারো দিনে কাজটি সম্পূর্ণ করেন। বিভিন্ন ভিজুয়্যাল মুভমেন্ট, স্ট্রাকচার এডিটিং এর সাথে সমন্বয় করে এত ভালো আবহ সংগীত নির্মাণ করা ছিলো সে সময়ের প্রেক্ষাপটে বিপ্লবাত্মক একটি কাজ। আজেস্টোইন পরবর্তীতে সে সম্পর্কে বলেন, “I told Meisel I wanted the score to be rhythm, rhythm, and above all pure rhythm,”

যা ছবিটিকে ভিন্ন মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছিলো।

তর্ক বিতর্ক:

আইজেনস্টাইন তার এই প্রজেক্টটিতে মূল নায়ক হিসেবে বিদ্রোহ সত্যিকারের অংশগ্রহণকারীকে Vakulinchu কে  দিয়ে অভিনয় করান ও পরামর্শ গ্রহণ করেন। যা চলচ্চিত্রটিতে ঐতিহাসিক পুঁজি আনায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে এখানে তিনি এখানে কোন রকম ব্যক্তি চরিত্র নির্মাণ করা থেকে বিরত থাকেন। তিনি ক্রাউড সিকোয়েন্স ও অপেশাদার অভিনতাদের দিয়ে চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন।

এই ছবিটির বর্ণনার ভাষা এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, রাতারাতি তা  বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক নেতাদের চক্ষুশূলে পরিণত হয়। তারা ছবিটি বিদ্রোহের ইন্ধন যোগাবে বলে ধারণা করতে থাকেন।

ফ্রান্স সরকার সেদেশে সাধারণ দর্শকদের ছবিটি দেখা নিষিদ্ধ করেন। যতগুলো কপি পাওয়া যায় পুড়িয়ে ফেলা হয়। যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ করা হয়। লন্ডনে শুধুমাত্র একটি ফিল্ম ক্লাবে ছবিটি প্রদর্শন করা সম্ভব হয়। ছবিটি সেদেশে ১৯৫৫ সাল পযন্ত নিষিদ্ধ ছিলো। জার্মানীতে সশস্ত্র সেনারা ছবিটি দেখার অনুমতি পাননি।

এমনকি সোভিয়ত ইউনিয়নেও ছবিটি কাট ছাট ও পরিবর্তীত করে বিধি নিষেধ আরোপ করা হয় দাঙ্গা হাঙ্গামা বিদ্রোহকে যখন আর ভালো চোখে দেখা হয়নি।

উপসংহার:

নিত্যনতুন এত সব উদ্ভাবনী কৌশল, বাস্তবিক অভিজ্ঞতা সম্বলিত গল্প, নির্মাণ কাঠামো ও পরবর্তীতে ছবিটিকে নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা, সব দিক থেকেই বলা যায় ব্যাটেলশিপ পটেমকিন একটি বৈপ্লবিক চলচ্চিত্র।

Leave A Reply

Your email address will not be published.