যেভাবে পারমাণবিক শক্তিধর হলো উত্তর কোরিয়া

0 991

ইসরায়েল ব্যতীত পৃথিবীর মোট ৮ টি দেশ নিজেদের পারমাণবিক শক্তিধর বলে দাবি করে। উচ্চাভিলাসী ও ব্যয়বহুল এই প্রযুক্তি উত্তর কোরিয়ার একদিনের অর্জন নয়। পারমাণবিক অস্ত্রের জন্য তাদের ধ্যান জ্ঞান, বহু বছরের সাধনা ও সদিচ্ছাই বর্তমান এই সক্ষমতার কারণ।

ধারণা করা হয় বর্তমানে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রের মজুদ সংখ্যা ১৩ থেকে ৩০ টি। ২০২০ সাল নাগাদ এ সংখ্যা ৫০ ছাড়িয়ে যাবে বলে আশংখা করা হচ্ছে।

কিন্তু কিভাবে সব দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন একটি দেশ এত উচ্চ প্রযুক্তি সম্পন্ন পারমাণবিক সক্ষমতা লাভ করলো। তা সবাইকে ভাবায়। এর সাথে  অতীতের সামরিক ও রাজনৈতিক কারণ ও এর সাথে জড়িত।

কোরিয়ান যুদ্ধ,

১৯৫০ সালে কোরিয়ান যুদ্ধকালীন সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্র্যুামেন হুমকি দিয়েছিলেন এই বলে, প্রয়োজনে যেকোন সময় তিনি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবেন। ধারণা করা হয় যুদ্ধ শেষ হবার আগ পযন্ত প্রায় ৬ লক্ষ টন বোমা যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়ায় নিক্ষেপ করেছে। ইউএস এয়ারফোর্স জেনারেল কোর্টিস পরবর্তীতে স্বীকার করেন, সেই যুদ্ধে কোরিয়ার ২০ শতাংশ নাগরিকের মৃত্যু হয়েছিলো।

কোরিয় যুদ্ধ অবসানের পর উত্তর কোরিয়া নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বদ্ধ পরিকর হয়। তারা তাদের যুদ্ধকালীন মিত্র চায়নাকে অনুরোধ করে পারমাণবিক প্রযুক্তিতে সাহায্য করার জন্য। উত্তর কোরিয়ার জনক কিম ইল সাং  চায়নার শাসক মাও জে ডং এর কাছে পরপর দু বার সাহায্য চেয়েছিলেন। কিন্তু দুবারই চায়না সাহায্য করতে অস্বকৃতি জানায়। উপায়ন্তর না পেয়ে উত্তর কোরিয়া নিজেদের পথ নিজেরাই খুঁজে বের করতে শুরু করে।

সোভিয়েত সমর্থন,

প্রাথমিক অবকাঠামো নির্মাণে সোভিয়েত সরকারই উত্তর কোরিয়াকে প্রথম সাহায্য করেছিলো। উত্তর কোরিয়া তাদের বিজ্ঞানীদের সোভিয়েত ইউনিয়নে প্রশিক্ষণ নিতে পাঠায়। তাই সোভিয়েত সরকারের সহযোগিতায় উত্তর কোরিয়া তাদের প্রথম নিউক্লিয়ার রিয়েক্টর স্থাপনের কাজ শুরু করে ১৯৬৪ সালে। তখন সেটা শুধুমাত্র চিকিৎসা, শিল্প ও গবেষণার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হতো। শুরু থেকেই অস্ত্র বানানোর কাজ তারা শুরু করেনি। কিন্তু কিছু বছরের মধ্যেই উত্তর কোরিয়া তাদের অস্ত্র প্রযুক্তির উন্নতি ঘটাতে থাকে এবং পৃথিবী ব্যাপী তাদের ছড়িয়ে থাকা তাদের সেরা বিজ্ঞানীদের দেশে আসতে বলে পারমাণবিক কর্মসূচি সমৃদ্ধ করার জন্য।

উল্লেখ্য, পারমাণবিক প্রযুক্তিতে বেশ কিছু সক্ষমতা অর্জন করলেও প্লুটোনিয়াম অস্ত্র বানানোর সামর্থ্য উত্তর কোরিয় বিজ্ঞানীদের ছিলো না। সত্তর আশির দশকে পারমাণবিক নজরদারির দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে, বেলজিয়ান কিছু বিজ্ঞানীর কাছ থেকে প্লুটোনিয়াম প্ল্যান্টের নকশা হাতিয়ে নেয় উত্তর কোরিয়া। পরবর্তী দশ পনের বছর লেগে যায়, তাদের প্ল্যান্ট স্থাপন, উন্নয়ন, কাজ শুরু করা, উৎপন্ন ও ব্যবহার করতে।

সিআইএ ডিরেক্টর জর্জ টেনেট ২০০৩ সালে সিনেটে প্রথম আশঙ্গা প্রকাশ করেন উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক ওয়ারহেড তৈরি করে থাকতে পারে। উত্তর কোরিয়া তখন একটি প্রতিনিধি দলকে তাদের প্ল্যান্ট পরিদর্শনে আমন্ত্রণ জানায়। পরিদর্শকরা সেখান থেকে ফিরে তেজস্ক্রিয় প্লুটোনিয়াম বিস্তারের ব্যাপারে আশঙ্কা প্রকাশ করেন। এর দু বছর পর ২০০৫ সালে উত্তর কোরিয়া তাদেরকে পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করে। এরপরের বছর তারা পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়। কোরিয় বিজ্ঞানীরা এরপর প্লটোনিয়াম পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়ে ইউরেনিয়াম পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণে জোরদার করেন।

পাকিস্তানী সহযোগিতা,

ধারণা করা হয় ইউরোনিয়াম নির্ভর উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক প্রকল্পের প্রধান সাহায্য এসেছিলো আব্দুল কাদের খানের মাধ্যমে। তিনি পাকিস্তান থেকে চুরি করে এ প্রযুক্তি পাচার করেন বলে ধারণা করা হয়। তিনিএ সময় ইরান ও লিবিয়ার সাথেও কথা বলছিলেন। অন্য একটি ভাষ্যমতে, উত্তর কোরিয়া পাকিস্তান সরকারি ভাবেই গোপনে প্রযুক্তি শেয়ার করে। উত্তর কোরিয়া পাকিস্তানকে ব্যালেস্টিক মিসাইল টেকনলোজি দিয়েছিলো বিনিময়ে পাকিস্তান দিয়েছিলো ইউরোনিয়াম সমৃদ্ধ পারমাণবিক বোমা প্রযুক্তি।

বিশ্ব মোড়লদের যেভাবে ফাঁকি দিলো,

পারমাণবিক প্রযুক্তির জন্য উত্তর কোরিয়াকে বেশ কিছু সরঞ্জাম বাইরের দেশ থেকে কিনতে হতো। কঠিন নজরদারির মধ্যেও অভিনব এক উপায় বের করেছে উত্তর কোরিয়া সরকার। তারা চীনে বসবাসরত কোন লোক বা কোম্পানির সাথে প্রথমে যোগসূত্র স্থাপন করতো। তারপর সে কোম্পানির মাধ্যমে সবাইকে ফাঁকি দিয়ে ইউরোপের দেশগুলো থেকে প্রযুক্তি সরঞ্জাম কিনে নিতো।

অবশেষে পারমাণবিক বোমা,

উত্তর কোরিয়া ২০১৩ সালে তাদের এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক পরীক্ষাটি চালায়। ২০১৫ সালে তারা সাবমেরিন থেকে ব্যালেস্টিক মিসাইল উৎক্ষেপণে সফলতা অর্জন করে। পরবর্তী বছর  তাদের হাইড্রোজেন বোমা আছে বলে দাবি করে উত্তর কোরিয়া। গত বিশ্ব রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে অস্থিরতার জন্ম হয়, যখন উত্তর কোরিয়া নতুন করে দাবি করে তাদের মিসাইল নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড সহ যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখন্ডে আঘাত হানতে সক্ষম। যা বিশ্ব্যাপী তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো ভীতি তৈরি করে।

ভবিষ্যতে কি হবে,

অবরোধ আরোপ বা হুমকি দিয়ে উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক অস্ত্র থেকে দূরে রাখা যাবে না তা অনুমেয়। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের হুমকি থেকে নিরাপদ থাকতে তারা যেকোন পদক্ষেপই গ্রহণ করতে পারে, সে কথা নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়।

তথ্যসূত্র: গ্লোবাল নিউজ, সিএনএন, টেলিগ্রাফ

Leave A Reply

Your email address will not be published.