লা ভার্নে ও একটি অপ্রত্যাশিত বিকেল
ডানকিন ডোনাট’স থেকে লিংকন ওয়ে পেরিয়ে, পাঁচ মিনিটের পথ। এ পাশটা যে খুব কোলাহল মুখর তা নয়। কদাচিৎ দু একটা গাড়ি চলাচল করে। অনি ছায়ায় একটা বেঞ্চিতে বসলো। নোটবুকস আর জার্নালগুলো পাশে রেখে ভারমুক্ত হলো সে।
সবুজ পার্কে একা বসে থাকা ওর খুব পছন্দ তা বলা যাবে না। তবে কখনো আমরা সবাই একা সময় কাটাতে চাই। অঢেল ক্লান্তির অবকাশ নয়, একটু বিশ্রামের প্রয়োজন।
ফোন স্ক্রিণে ভেসে উঠছে থিও’র নাম।
প্রথম যখন এখানে আসা হয়। অনির দুশ্চিন্তার বিষয় ছিলো দুটি। এক, প্রতিদিনই তাকে নতুন কিছু না কিছু শিখতে হচ্ছে। যেন ভুল সংশোধন করার চাইতে, ভুল করাটাই ছিলো স্বস্তির। আর দ্বিতীয় কারণটা হলো, ছবি তুলতে গিয়ে। পুরো ক্যাম্পাসটাই পরিস্কার-পরিপাটি ও সুন্দর। যেন ফ্রেম থেকে বাদ দেবার মতো কিছু নেই। ক্যামেরায় বন্দি হবার ব্যাধি’টা এখানে এসেই শুরু হয়েছে। আগে ছিলো না।
Ames, IA 50011, USA
শহরতলীর অ্যামস শহর!
এই শহরের সবচেয়ে বড় পরিচয়, আইওয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি। মজার বিষয় হলো, এখানের অর্ধেকের বেশি লোকসংখ্যা বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষার্থী। ইউনিভার্সিটির একটা ডাকনাম আছে, “সাইক্লোন”। অদ্ভূত নাম। এমন নাম হবার কারণ কি? জানা হয়নি। অফিসিয়াল রঙ সোনালী, আর মাসকট হলো, “সাই দ্যা কার্ডিনাল”। ক্যাম্পাসে অনির প্রথম ছবি মাসকট’টার সাথে তোলা।
আমেরিকার সামরিক অর্থনীতি বা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অ্যামস কোন গুরুত্বপূর্ণ নাম নয়। শুধুমাত্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আইওয়া ইউনিভার্সিটি, ম্যানহাটান প্রজেক্টে ভূমিকা পালন করেছিলো। তাই সিটি অ্যামসের বড় পরিচয় এর নান্দনিক ভিন্নতায়; সেই সাথে পরিমিত ও পরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে। বিষয়টি যে কোন শহরের জন্য দৃষ্টান্ত হতে পারে। ২০০৮ সালে সিএনএন এর এক জরিপে, দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার জন্য এটি আমেরিকার সেরা বাসস্থান হিসেবে নির্বাচিত হয়। “অ্যামস” নামটা ফ্রেঞ্জ হতে আসা, যার অর্থ ফ্রেন্ড বা বন্ধু। কোন দ্বিধা না রেখেই অ্যামস কে বন্ধু শহর বলা যায়।
আইওয়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে সাদা কালো সব বর্ণের মানুষ আছে। এশিয়ানদের মতো, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকেও ছেলেমেয়েরা এখানে পড়তে আসে। তবে পরিচিত হবার মতো ছোটখাট ভারতীয় কমিউনিটি রয়েছে একটি।
ইচ্ছে থাকলে যেকোন কাজ করার সুযোগ প্রচুর। শিক্ষার্থীরা সুবিধেমত কেউ কেউ পার-টাইম জব বেছে নিচ্ছে অথবা চোখ মুখ বুঁজে পড়ালেখায় ডুবে আছে। বলা চলে, ঘড়ির কাঁটায় ব্যস্ততা যেমন নেই, তেমনই সবারই রয়েছে তাড়া। সবকিছু মিলিয়ে বন্ধুত্ব বা নিজের মতো করে কাউকে জুটিয়ে নেয়ার ব্যাপারটায় কারোরই বাকি থাকছে না।
অনির কাছের বন্ধু বলতে রয়েছে কয়েকজন। এদের একজন নেটিভ, নাম পেটার। বাকি দুজনের একজন ভারতীয় ছেলে বিনোদ অন্যজন জাপানি মেয়ে সারা। এখানে আসার তিন মাসের মধ্যেই সারা আর বিনোদের রিলেশনসিপ হয়ে গেছে। মেয়েটা হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে যেন। ওর একজন অভিভাবক দরকার ছিলো। একটা মেয়ে স্বাবলম্বী হলেও কিছু সিদ্ধান্ত পরিবারের বাইরে থেকে নিতে পারে না। এটুকু সাহস দেখালে সমাজ তাকে ত্যাগ করে। সাধারণ এশিয়ান মেয়েদের চেয়ে সারা একটু ভিন্ন ও স্বাধীনচেতা। চ্যালেঞ্জ নিতে জানে। পেটার অনিকে খুব সাহায্য করছে। ও বেশ মার্জিত, নিরহংকারী বলে ওকে বিশ্বাস করা যায়। ক্যাম্পাসে অন্যরা যখন পেটারকে ইশারা ইঙ্গিত করে, বেচারা বেশ লজ্জ্বায় পড়ে যায়।
আবারও টেক্সট করলো থিও অ্যারন।
অ্যারনে’র সাথে অনির পরিচয় অ্যামস টু শিকাগোর এক দীর্ঘ ট্রেনে যাত্রায়। ওর পূর্বপুরষরা সবাই গ্রিসের বাসিন্দা। অ্যারন আইনের উপর পড়ালেখা শেষ করে এখন শিকাগোতে ব্যবসায় জড়িয়েছে। ট্রেনেই ওদের কিছু কথা হয়। অনির মোবাইল, আর নাম ঠিকানা টুকে মজা করেই অ্যারন বলেছিলো, সময় করে একদিন তোমাকে দেখতে যাব।
এরপর যা ঘটলো, অনি ভাবতেও পারেনি। তাকে অবাক করে দিয়ে হঠাৎ অ্যারন একিদন ক্যাম্পাসে চলে এলো। একবার ফোন করেও জানায়নি সে। দুজনে হিল্টন কলোসিয়ামে বাস্কেটবল দেখার পর সন্ধ্যায় ঘুরতে বেরুলো তারা। সুন্দর একটা সন্ধ্যা কেটেছিলো সেদিন। এখনো প্রতি সপ্তাহে, দুশো মাইল পাড়ি দিয়ে অ্যারন অনির সাথে দেখা করতে আসে। প্রথম প্রথম ভাবলে রোমাঞ্চ হতো, এখন অস্বস্তি লাগে।
অনি’র কখনো খুব মন খারাপ হলে, ক্যাম্পাসেই ঘুরে বেড়ায় অথবা কোথাও নিরিবিলে বই পড়ে সময় কাটায়। ওভাবে দূরে কোথাও যাওয়া হয়ে উঠে না। এই লা ভার্নে লেকটার মতো আরো কিছু জায়গা আছে ক্যাম্পাসে, শুধু বসে থাকার মতো। ক্রিস্টিয়ান পিটারসেন নামক গুণী এক ভাস্কর “Fountain of the Four Seasons” নামে অদ্ভূত সুন্দর এক স্থাপত্য বানিয়েছেন। এখানে চারজন রেড ইন্ডিয়ান নারী অ্যামস শহরের চারটি ঝতুকে প্রতিনিধিত্ব করছে। ফোয়ারা’র এ জায়গাটা থেকে বেল টাওয়ারটা সবচেয়ে বেশি সুন্দর দেখায়।
“Madonna of the praire” ও “The marriage Ring” তার আরো দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। লুইস জেমিনেজ নামক আরেকজন শিল্পী বানিয়েছেন, “Border Crossing” নামক ভাস্কয। এসব ই স্টেট ইউনিভার্সিটির সম্পদ।
ব্যস্ত জীবন আর অবিরাম ব্যস্ততার মাঝে দেশ ছেড়ে এখানে আসায়, ভালো বা খারাপ লাগার কিছু নেই। জীবনের এ বদলটা যে পরিকল্পনা করেই নেয়া। হুম, লোকে ঠিকই বলে, ইন্টারনেটের এ যুগে এখন সবকিছুই সহজ, তবে যান্ত্রিক। কেউ “অনি” বলে নাম ধরে ডাকলে অচেনা শোনায়, বুঝে উঠতে সময় লাগে। আগের মতো নয়। মাঝেমাঝে দেশের খাবারের জন্য সমস্তটা হাহকার করে। সস্তা ডাল ভাত অপিরিচত এ জগতে অমূল্য। হাজার ভালো থাকার মাঝেও, কখনো কিছু একটা ব্যতয় হলে সবার আগে দেশের কথাই মনে পড়ে যায়। তখন মন খারাপ হয়।
অ্যারন এখন ক্যাম্পাসে। ও বারবার ফোন করেছে।
অনি ফোনটা ধরলো না। প্রতি সপ্তাহে একবার করে দেখা করতে হবে এমন তো কোন কথা নেই। দু একটা স্থবির অপ্রত্যাশিত বিকেল কখনো নিজের জন্য থাকা উচিত। অনি আরেকটু ভাবলো, পরক্ষণেই উঠে দাঁড়ালো। না, ও এটাতে অভ্যস্ত নয়, নিস্তেজ সময়ক্ষেপণ যে ওর ভালো লাগে না। তাহলে কি আর এত দূর আসা হতো?
এভাবে সময় কাটে,
উৎসবের আগুন লাগে ক্যাম্পাসে, ভিসওয়া ফেস্টিভ্যালে সবটা হয় রঙ্গিন। জ্যাক ট্রাইস স্টেডিয়ামে বাঘের মতো গর্জন শোনা যায়।
অনি’র বুকমার্কটা নতুন করে করে সাজাতে হয়, কিছু গল্প পড়ে যায় পিছনের পাতায়, নতুন গল্পদের ভিড়ে।
কখনো রোদ জ্বলমলে আকাশ, সুশোভিত ফুলের সমারোহ অথবা কিছুকালের শীতের ঝাপটায় বিবর্ণ হয় অ্যামস শহর। শহরের আলো, মানুষের চিৎকার কখনো লেজার লাইট আর তীব্র ঝলকানিতে একাকার হয় শান্ত এ আঙ্গিনা। রাতের চির অচেনা শহরে মেয়েটি একা রাস্তায় হাঁটে আর ভাবতে থাকে, এখানে কি কখনো কোন লালন আসেনি?
আজ বেশ কদিন যাবৎ, লেক লা ভার্নের রাজহাঁস দুটি অভিমান করে আছে। অনি অপেক্ষা করতে থাকে ওদের অভিমান কবে মিটবে!
