গল্প: পেট্রোলবোমা
প্রারম্ভিকতা ও সংক্ষেপ:
রাজনৈতিক হানাহানি সহিংসতা আমাদের দেশের নিত্যনৈমত্তিক ঘটনা। কত মানুষের প্রাণ যে অবেলায় ঝড়ে যায় সে খবর আমরা কেউই খুব বেশিদিন মনে রাখি না। বর্তমান সময় চলমান অস্থিরতার এক মূর্তমান আতংকের নাম হলো পেট্রোলবোমা। রমানা পার্কের সামনে পেট্রোলবোমায় দগ্ধ মানুষগুলোর সম্মানে এই গল্প।
ড্রাইভার রশিদ। সদরঘাট মিরপুর রুটে সে নতুন। ছ মাস হলো রশিদ এ লাইনে নেমেছে। তার হেল্পারের নাম হাবিব। হাবিব বয়সে কিশোর হলেও কাজ কর্মে ঝানু। সে একাই হেল্পার ও কন্ট্রাকটরের কাজ করে। হাবিব ও আর তার ওস্তাদ রশিদ সম্পর্কে পাড়া প্রতিবেশী এবং তাঁদের দুজনেরই বাড়ি চাঁটগায়ে। বাসায় হাবিবের পঙ্গু অন্ধ মা। তিনি বিছানায় শয্যাশায়ী। হাবিবের অন্য ভাই বোনরা তাদের অসুস্থ মায়ের খোঁজ খবর রাখে না বলে হাবিবই এ মহিলার একমাত্র সম্বল। হাবিবের মা’কে রশিদ চাচী ডাকতো। মহিলা একটা সময় রশিদকে খুব খাতির যত্ন করেছেন। তাই আজ বুড়ির বিপদের দিনে যখন তার অন্য ছেলেমেয়েরা পাশে নেই, রশিদ মিয়া তার পাশে দাঁড়িয়েছে। হাবিবকে ও সে নিজের ছোট ভাইয়ের মতোই দেখাশোনা করে,কাছে আগলে রাখে। হাবিব নিয়ম করে প্রতিমাসে একবার বাড়ি যায়। নিত্য নতুন জিনিস মাকে কিনে দেয়। মায়ের সুখ ছাড়া কিশোর হাবিবের জীবনে আর কিছু নেই। আর হাবিবের অন্ধ মা ও সবসময় তার ছেলের পথ চেয়ে থাকেন। হাবিব মায়ের জন্য এ মাসে নতুন শাড়ি কিনেছে। সামনের শুক্রবারে সে বাড়ি যাবে।
শীতের দিন।
রাস্তাঘাট চারদিকে সুনসান নীরবতা। প্রতিদিনকার পরিচিত মানুষের কাছেও এ এক অচেনা শহর। একটু পরেই সন্ধ্যের আলোর রেখাটা মিলিয়ে যাবে এই বলে। লোকাল বাসটা সদরঘাট স্টপেজে দাঁড় করানো। ভিতরে কিছু লোক। এক দুজন করে আরো মানুষ জন উঠছে। রশিদ মিয়া ইঞ্জিনের উপর বসে গলার মাফলারটা ভালো মত জড়িয়ে নিলো। বোতলে করে ঢক ঢক করে এক বোতল পানি শেষ করে ফেললো নিমিষেই। হাত থেকে ফসকে কিছু পানি পড়লো এদিক সেদিক। রশিদ মিয়ার সেদিকে বিকার নেই।
সে হাবিবকে বললো, কিরে গাড়ি ছাড়বাম নাকিরে? প্যাসেঞ্জার তো দেহি না।
রশিদ উত্তর দিলো, ওস্তাদ দেহেন আরেকটুন। সিট ভরে নাই। চা লাগবো?
“দিতে ক দুইটা?”
“ভাঁপ পিঠা খাইবেন?”
“তুই খা, জন্মের খাওন খা।”
গাড়ির স্টেয়ারিং-এ একটু হাত নেড়েচেড়ে রশিদ মিয়া বাস থেকে নিচে নেমে গেলেন। বাসে ভিতর সবাই এক সিট এক সিট খালি রেখে রেখে একা একা বসেছে। এ স্বার্থপর শহরে সবাই নিরাপদ দূরত্বে থাকতে চায়। বিপদে না পড়লে কেউ কারো মুখটা দেখতে চায় না। তার উপর সময়টা খুব খারাপ। দেশের এমন পরিস্থিতি হলে কারো মনই ভালো থাকার কথা না। প্রতিদিনই রাস্তাঘাটে মানুষ মরছে। এভাবে কদিন চলবে কে জানে!
প্রথম দুপাশের সিটে বসা কোর্ট প্যান্ট পড়া এক ভদ্রলোক আর অন্যপাশে মাথায় টাক সানগ্লাস পড়া এক সৌখিন। লোকটির আপাদমস্তক রংচটা শার্ট আর জিন্স। বাস ছাড়ার কথা শুনে তিনি তার হাত ঘড়িতে চোখ বুলালেন। পাশের সিট দুটি খালি। একটু পড়েই তার কাছে বসলেন লুঙ্গিতে কাঁছা মারা মুরগি বিক্রেতা। তার হাতের দু জোড়া মুরগি কক করছে। লোকটার গায়ে ছিলো উৎকট গন্ধ।
সৌখিন লোকটি বিনয়ের সাথেই বললো, “ভাই, আপনি একটু পিছনে গিয়ে বসেন।” মুরগি বিক্রেতা লেকাটি কোন কোন রকম অবাক হলেন না তর্কেও জড়ালেন না। এ অদ্ভূত দুনিয়ার বেশিরভাগ লোকই অবুঝ নন। সবাই নিজের দুর্বলতা বুঝে। এরপর হুড়মুড়িয়ে ঢুকলো তিন চারজন হিন্দু মহিলা। তাদের কপালে সিঁদুর। সাথে আট ন বছরের ছোট এক বাচ্চা মেয়ে। সবচেয়ে অবাক ছিলো বাচ্চাটির পায়ের জুতো জোড়া। ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ হচ্ছিলো আর আলো ছড়াচ্ছিলো চারদিকে একটু পরপর। সবাই মজা পাচ্ছিলো তা দেখে। হাবিব বাচ্চাটিকে কোলে নিয়ে কয়েকবার পায়ে টিপে টিপে শব্দ করতে থাকলো। মেয়েটি তো কেঁদেকেঁটে অস্থির।
স্কুল ব্যাগ কাঁধে নিয়ে শেষের সিটে বসলো এক ছেলে। মাঝের এক ভদ্রলোক মোবাইলের আলোয় পত্রিকা পড়ছেন এখন। হয়তো সারাদিন সময় পাননি তিনি। তাই অবসর সময় কাজে লাগাচ্ছেন। মাঝবয়সী এক লোক কোলে ছোট বাচ্চা নিয়ে উঠলেন। বসলেন স্কুল পড়ুয়া ছেলেটির পাশে। হাবিব শেষ বারের মতন গলা ছেড়ে ডাকছিলো বাইরে হাঁটতে হাঁটতে। ওই গুলিস্থান, শাহবাগ,ফার্মগেট, আসেন আসেন আসেন। পাঞ্জাবি পায়জামা আর টুপি পড়া এক মুসল্লি তার ছোট ছেলেকে কোলে নিয়ে গাড়িতে উঠছেন তারপরই উঠলো ইউনিভার্সিটি‘র এক ছাত্র।
এদিকে চা খাওয়া শেষ রশিদ মিয়ার। সে এখন পান মুখে পুরে সিগারেটে সুখটান ধরিয়েছে। আরো একজন দুজন করে কয়েকটা সিট বাদে বাসে লোক ভর্তি হলো। এরই মধ্যে কারো কারো ধৈয্যের বাঁধ ভেঙ্গেছে। তারা তাড়াহুড়ো করছে বাস ছাড়বার জন্য। ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া ছেলেটি তার দায়িত্ব মাফিক হাবিবকে ধমক দিলো, “এই বেটা,পাবিলিকরে আর কতক্ষণ দাঁড় করায়া রাখবি?”
হাবিবের গলা চড়ানো বন্ধ করলো। সে বাসের পিঠে কয়েকটা শব্দ চাপিয়ে বললো, “ওস্তাদ গাড়ি চালু করেন।”
রশিদ মিয়া গাড়ি স্টার্ট দিলেন। গাড়ি চলছিলো ধীরে ধীরে। কোর্টের সামনে থেকে উঠলো কিছু লোক। মাথায় ঘোমটা দিয়ে এক যুবতী উঠলো সাথে তার স্বামী আর শ্বাশুড়ি। ইঞ্জিনের উপর বসলো তারা।
রশিদ হাবিবকে হুংকার ছেড়ে বললো, “গাড়ির গেট লাগা। ইস্টপ ছাড়া লোক তুলবি না।”
হাবিব মাথা নাড়ে।
গাড়িতে লোক জমে আছে। দুজন শুধু দাঁড়িয়ে। হর্ণ বাজাতে বাজাতে গাড়ি চলছে। কোর্ট পড়া লোকটি গলায় মাফলার জড়াতে জড়াতে বলে উঠেন, “গেট লাগারে বাপ গেট লাগা। যে পরিস্থিতি কাউরেই বিশ্বাস করা যায় না রে ভাই। প্রতিদিনই মানুষ মরতাছে।”
সাথের সানগ্লাস পড়া লোকটা মোটা গলায় বললো, “আপনের এত ডর কিসের?”
“কি কন মিয়া আপনে কি দেশে নাই?”
পিছনের লোকটা কথা না বলে পারলেন না। হতে পারে তিনি কোন অফিসের নিম্ন বেতনভোগী কোন কর্মচারী। বলে গেলেন তিনি, “সকাল বেলা ঘর থেইকা বাহির হওনের আগে বউরে বলছি,হাতে জান নিয়া বাহির হইলাম দোয়া করিস। বউ কইলো সাবধানে থাইকো। এর বেশি কি আর কইতে পারেন কন? যে মানুষগুলা মরতাছে তারা কি অসাবধান ছিলো নাকি ভাই? মরণ গায়ের উপর আইসা পড়লে কিছু আর করনের থাকে না। গরিবের মরণ রাস্তাঘাটেই হয়।”
বাসে অন্যরাও লোকটির কথার সাথে তাল মিলায়। তারা কোন পার্টি বুঝে না দল বুঝে না। কে ক্ষমতায় আর কি বিপরীতে তা ভাবে না। শুধু ডাল ভাত খেয়ে পরিবার পরিজন সহ সুস্থদেহে বেঁচে থাকতে চায়। এ অপয়া দেশে কি তাও সম্ভব হবে না। মুরগি বিক্রেতা লোকটি মাথা নিচু করে সব শুনছিলো। কেউ হয়তো জানবে না দেশের একজন নিচু শ্রেণীর লোকটি একজন মুক্তিযোদ্ধা। দেশের জন্য তার ভালোবাসা বা মমত্ববোধ অন্য কারো চেয়ে কম না। শুধু সে গলা ফাটিয়ে কথা বলতে পারে না। সব শুনে যায়। আর তার কল্পনায় দোল খেলে যুদ্ধের সে সময় কার কথা। কত ভালোবাসা ছিলো এ দেশেটার জন্য সব মানুষের। কোথায় গেল সেসব? অপয়া দেশটা। ভাগ্যের বলি হয়ে তিনি এ বুড়ো বয়সে এ শহরে মুরগি বেঁচেন।
পেপার পড়তে থাকা লোকটি চোখ তুললেন। “আরে ভাই মানুষ না মারলে কি আর আন্দোলন জমে? পলিটিকস বুঝেন না?”
“দুই মহিলা দেশটারে জ্বালায়া খাইলো।”
পিছন থেকে চাপ দঁড়ি সমেত কেউ একজন বললেন। তাকে দেখতে বাকের ভাইয়ের মতন লাগছিলো।
“দেশের পাবলিকের কিছু কওনের নাই। অধিকার ও নাই। হেরা সবাই নিজেগো ভালো বুঝে।”
“কেন ভাই আপনে কি এরশাদ করেন? না গামছা পার্টি? চ্যাঁইতেন না। মজা করলাম।”
“আরে ওইটা একটা মাগি। ওইটার কথা কইয়েন না।”
বলেই তিনি জ্বিবে কামড় দিলেন। বাসে অনকে মহিলা আছে। এভাবে বলা ঠিক হয়নি। অন্যজন ভাবছিলেন,রাস্তাঘাটে যার তার সাথে কথা বলা ঠিক না। এরা কোথায় কি বলতে হবে কিছু জানে না। মূর্খ লোক সব।
হাবিব ভাড়া তুলছিলো। সে বলে উঠলো, “ভাই বাসের মইধ্যে রাজনৈতিক আলাপ নিষিদ্ধ। মালিকের না আছে।”
কোর্ট প্যান্ট পড়া ভদ্রলোকটি ক্ষেপে গেলেন। “পোলার কথা শুনছেন? আওে তোরাই তো মরছ।”
“মরলে মরুম। কিছু তো আর করার নাই।”
হাবিবের এই নিচু শব্দগুলো অন্য কেউ শুনলো না।
গাড়ি এখন জিরো পয়েন্টে। চারদিকে মাগরিবের নামাযের আযান শুরু হলো। রাস্তার হলুদ বাতিগুলো জ্বলে উঠলো। বায়তুল মোকাররমের চারপাশে আলো জ্বলজ্বল করছে। মুসলিম মহিলারা মাথায় কাপড় দিলো। এখানে নেমে গেল কিছু লোক।
“ভাই দেখছেন শহরে কোন মানুষই নাই। বিপদে না পড়লে ঘর থেইকা বাহির হয় না কেউ। আমগো তো পেট চলতো না।”
“মহিলা নিয়া বহির হইছি। আল্লায় জানে রাস্তায় কি হয়। আমরা দৌড় ঝাঁপ দিতে পারে এগো কি হয় কন?”
বললো মা বউ নিয়ে উঠা লোকটি। বউটি তার তখনই চিমটি কাটলেন। রাজনৈতিক আলাপে যেন তার স্বামী না জড়ায়। এদিকে হিন্দু ঐ মহিলারা হয়তো ঢাকা শহরে নতুন। একজন বললেন, “ড্রাইভার সাব,ফার্মগেট কতদূর। ব্রিজের নিচে নামাই দিয়েন আমাগোরে।”
রশিদ মিয়া বললো শুধু, “বহেন, আছে।”
বাচ্চা মেয়েটি পুতুল নিয়ে খেলছিলো।
মাঝে বসে থাকা হুজুর কথায় কথায় তার ব্যক্তিগত ঘটনা সবাইকে শোনালেন। হরতাল অবরোধে তার এক বোনের ছেলে গত সপ্তাহে মারা গেছে। ছেলেটা কখনো কোন রাজনৈতিক দল করেনি। একটা দোকানে চাকরি করতো। দুপুরে ভাত নিয়ে চাচ্ছিলো কাজে আর রাস্তায় মারা পড়ে। এই বিচার তিনি শুধু আল্লাহর কাছেই চান। কোন কিছু করার নেই তাদের। ভার্সিটি পড়ুয়া যুবকটি বললো, “ভাই আপনারা দেশের মানুষ আগে ভালো হন। সব ঠিক হয়ে যাবে। ভোটের আগের দিন টাকা খাওয়া বন্ধ করেন। মার্কা না দেইখা লোক দেইখা ভোট দিয়েন।”
স্কুল পড়ুয়া ছোট বাচ্চাটি বিস্ময় নিয়ে সবার কথা শুনছিলো। সে আগামী দিনের প্রজন্ম।
গাড়ি চলছে দ্রুত হাইকোর্ট,শিক্ষাভবন, পেরিয়ে। জিন্স প্যান্ট পড়া লোকটার মোবাইল কেঁপে কেঁপে সিগন্যাল আসলো। সে এদিক ওদিক তাকিয়ে খুব সাবধানে মোবাইলে চোখ রাখলো।
“হই গাড়ি থামাও। নামাও আমারে।”
“ভাই স্টপেজে নাইমেন।”
“অই হারামজাদা। নামাইতে বলছি নামা।”
ভয় পেল সবাই। পলিটিকস করা লোকের মতন কন্ঠস্বর। সবাই হাবিব কে বললো,ওকে নামিয়ে দিতে। বাসটা থামলো,লোকটা নামলো। এরপর বাসটা চলা শুরু করছিলো আর খুব অল্প সময়ের ব্যবধান। হঠাত এক ঝলক আগুন রশ্মি ভেদ করে ছড়িয়ে পড়তে থাকলো গাড়িতে। মুহূর্তেই ঝলসে গেল অনেকের মুখ। ড্রাইভার রশিদ ওমা গো বলে চিতকার করে উঠলো। পুড়ে গেল তার শরীর। চিতকার করতে করতে বললো, “ভাই সবাই নামেন। বাসে পেট্রোলবোমা মারছে।”
খুব বেশি সময় পেল না সবাই। শিশু মহিলা সবার আহাজারি আর আর্তনাদে ভরে গেল বাসটি। সে বাচ্চা মেয়েটির কপালের পাশে আগুন জ্বলছিলো। সেই মুক্তিযোদ্ধা একাত্তরে যেমন মা বোন জন্য জীবন বাজি রেখেছিলেন এখনও মহিলাদের বুক আগলে বাস থেকে বের করে নিচ্ছিলেন। কোর্ট প্যান্ট পড়া ভদ্রলোকটি কিছু বুঝে উঠার আগেই জ্বলন্ত জ্বলতে লাগলেন। আর সে মৌলভী ও তার ছেলে সবার শরীর আগুনে জ্বলছিলো। জ্বলছিলো সে স্কুল পড়ুয়া ছেলেটি,আমাদের প্রজন্ম!
হাবিব মরে গেল সবার আগে। মরার আগে মায়ের মুখটা তার মনে পড়ছিলো কেবল।
